কীভাবে কম্পোস্ট তৈরি করবেন (নতুনদের জন্য) how to make compost (For beginners) .বর্তমান সময়ে বাগিনীরা জমিতে অধিক ফল ও ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রচুর পরিমানে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে থাকে। তবে ব্যাপকহারে এই রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে, মাটির উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং মাটির জৈব পদার্থ ও উপকারী অনুজীবের পরিমান দিন দিন কমতে থাকে। এবং মাটির পুষ্টি উপাদানের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কোনভাবেই ফল ও ফসলের ফলন ভালো হচ্ছে না । এজন্য জমিতে কম্পোস্ট সার ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।
যেসব উপাদান দিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করা যায়, তা হলো –
ফসলের অবশিষ্টাংশ
কচুরীপানা, লতা ও পাতা
সবজি বা ফলের খোসা
আগাছা, সবুজ ঘাস
বসতবাড়ির ময়লা আবর্জনা ও
খড়কুটা
পর্যান্ত পরিমানে গোবর
বাড়ির আশপাশে, ক্ষেতের ধারে গর্ত করে অথবা পুকুর বা ডোবার কাছে স্তূপ পদ্ধতিতে কম্পোস্ট তৈরি করা যায়। তবে গাছের ছায়ার নিচে হয় এবং সেখানে স্তূপ করা যায় এমন হলে তাহলে খুবই ভালো কম্পোস্ট তৈরি করা যায়। কারণ গাছের ছায়া রোদ বৃষ্টি প্রতিরোধ করবে এবং জৈব পদার্থের পচন ক্রিয়ায় সাহায্য করবে। বর্ষাকালে অথবা যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি, সেসব এলাকায় স্তূপ পদ্ধতিতে তৈরি কম্পোস্ট বেশ কার্যকর। গ্রাম বাংলায় এ পদ্ধতিকে গাদা পদ্ধতি বলা হয়।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :
1. সারের উৎস সমূহ : সফল কম্পোস্টিং এর ক্ষেত্রে , আপনার নাইট্রোজেনের জন্য সবুজ উপকরণ যেমন রান্নাঘরের বর্জ্য এবং ঘাসের প্রয়োজন। কার্বন, আর্দ্রতা এবং বাতাসের জন্য বাদামী উপাদান যেমন পিচবোর্ড, কগজ এবং শুকনো পাতা প্রয়োজন। এই উপাদানগুলি উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে আমন্ত্রণ জানায়, এবং উপাদানগুলিকে ভেঙে ফেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
2. কী অন্তর্ভুক্ত করবেন : গাছপালা, লতাপাতা থেকে রান্নাঘরের বর্জ্য (যেমন ফলের খোসা এবং উদ্ভিজ্জ অবশিষ্টাংশ) । ঘাসের টুকরা নাইট্রোজেন দিয়ে আপনার কম্পোস্টকে সুপারচার্জ করবে । কফি গ্রাউন্ডগুলিও একটি দুর্দান্ত সংযোজন হতে পারে। যেখানে বাদামী উপকরণের কথা আসে, তখন টুকরো টুকরো করা সংবাদপত্র, পেইন্ট বা টেপ ছাড়া কার্ডবোর্ড এর মতো আইটেমগুলির কথা চিন্তা করুন।
3. কী অন্তর্ভুক্ত করবেন না : অপচনশীল আইটেম যেমন চকচকে কাগজপত্র এবং রাসায়নিক পদার্থগুলি থেকে দূরে থাকুন। এছাড়াও, মাংস এবং পনিরের মতো অ-উদ্ভিদ-ভিত্তিক আইটেমগুলি এড়িয়ে চলুন, কারণ তারা অবাঞ্ছিত কীটপতঙ্গকে আকর্ষণ করতে পারে এবং পচতে বেশি সময় নেয়।
কম্পোস্ট সার তৈরির নিয়ম :
কম্পোস্ট সার তৈরির জন্য প্রথমে টুকরো কাগজ এর স্তর পরে ৪-৫ দিনের শুকনো কচুরিপানা ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলে ১৫ সেমি. পুরু স্তর সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাজা বা সবুজ কচুরিপানা ব্যবহার উচিত নয়, এতে পটাশ ও নাইট্রোজেনের উপাদান নষ্ট হয়। কচুরিপানা বেশি লম্বা হলে তা ১৫ সেমি. করে কেটে ব্যবহার করতে হবে।
এরপর এ স্তরের ওপর ২০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ২০০ গ্রাম টিএসপি সার ছিটিয়ে দেয়া ভালো। এতে পচনক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। সার ছিটানোর পর স্তরের ওপর ২.৫০-৫.০০ সেমি. পুরু করে গোবর এবং কাদা মাটির একটি প্রলেপ দিতে হবে। এর ফলে স্তরের ভেতর জীবাণুর ক্রিয়া বেড়ে যাবে এবং দ্রুত পচন কাজ সম্পন্ন হবে। এভাবে ১.২৫ মি.উঁচু না হওয়া পর্যন্ত বারবার ১৫ সেমি. পুরু করে শুকনো কচুরিপানা,আবর্জনা, খড়কুটো দিয়ে স্তর সাজাতে হবে এবং ২.৫০-৫.০০ সেমি. পুরু করে গোবর ও কাদা মাটি দিয়ে লেপে দিতে হবে। গাদা তৈরি শেষ হলে এর উপরিভাগ মাটি দিয়ে লেপে দিতে হবে এবং সম্ভব হলে কম্পোস্ট স্তূপ ওপর ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্তূপ বা গাদা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর একটি শক্ত কাঠি গাদার মাঝখানে ভিতরের দিকে দিয়ে স্তরগুলো অতিরিক্ত ভেজা কিনা তা দেখে নিতে হবে। যদি ভেজা থাকে, তাহলে শক্ত কাঠি দিয়ে গাদার উপর থেকে মাঝে মাঝে ছিদ্র করে দিতে হবে, যাতে বাতাস ভিতরে ঢুকতে পারে। এরপর গাদার ভিতরের অংশ শুকিয়ে গেলে ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে গাদ যেন অতিরিক্ত শুকিয়ে না যায়। যদি অতিরিক্ত শুকিয়ে যায়, তাহলে ছিদ্র পথে পানি বা গো-চনা ঢেলে গাদাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
পর্যাপ্ত পরিমানে গোবর, গো-চনা এবং ইউরিয়া গাদাতে ব্যবহার করা হলে স্তূপ তৈরির প্রায় ৩ মাসের মধ্যে তৈরি কম্পোস্ট জমিতে ব্যবহারের উপযুক্ত হবে। আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে যদি কম্পোস্ট গুড়াঁ হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে তা জমিতে ব্যবহারের উপযোগী হয়েছে।
কম্পোস্ট ব্যবহারের উপকারীতা :
১. মাটির গুনগত মান বৃদ্ধি করে ও মাটিতে পুষ্টির মান সমৃদ্ধ করে।
২. মাটিতে বেলের পরিমান বেশি হলে এই কম্পোস্ট পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং পুষ্টি উপাদান যোগ করে।
৩. কম্পোস্ট এটেল মাটিকে ঝুরঝুরে করে ও এর বায়ুচলাচল সচল করে।
৪. সবজি ফসলে মালচিং এর কাজ করে।
৫. ভূমিক্ষয় রোধ করতে সহায়তা করে।
৬. মাটিতে উপকারী অনুজীবের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে।
৭. মাটির ফ এর মান নিরপেক্ষ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা করে।
৮. টবের মাটিতে কম্পোস্ট ব্যবহার করলে চারা রোপন করে অধিক ফলন নিশ্চিত করে ।
কম্পোস্টিং এর আনন্দ :
কম্পোস্টিং এমন একটি যাত্রা যা বৃদ্ধি, ক্ষয় এবং পুনর্নবীকরণের প্রাকৃতিক চক্র সম্পর্কে শেখায়। এই শিক্ষা টেকসই, সমৃদ্ধ বাগান তৈরি করতে চাওয়া যে কোনও মালীর জন্য একটি মৌলিক অনুশীলন । এই সহজ পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে, আপনি ‘black gold বা কম্পোস্ট ‘ তৈরি করে ব্যবহারে আপনার মাটিকে সমৃদ্ধ করবে এবং আপনার বাগানের গাছগুলোর প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনবে। শুভ কম্পোস্টিং!
পরিশেষে, যদি মনে করেন লেখা গুলো বাগানীদের উপকারে আসবে, তাহলে ফেসবুকের পোস্ট টি শেয়ার করুন, নেক্সটে কোন বিষয়ে জানতে চান কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ


